Monday, November 7, 2016

বৃষ্টি ভেজার গল্প



এই দুপুর বেলা এমন বৃষ্টি নামবে ভাবিনি । নিউ মার্কেটে এসেছিলাম । অনেক কষ্টে একটা রিক্সা পাওয়া গেল । কোন মতে পলিথিন দিয়ে ঢেকে ঢুকে যাওয়ার চেষ্টা করছি তবে খুব একটা লাভ হচ্ছে না । ভিজে যাচ্ছি ঠিকই । রিক্সা চলতে শুরু করলে বৃষ্টির ছিটেফোটা ঠেকানো কষ্টকর হয়ে উঠল ।
নাহ ! আজকে খবর আছে ! বৃষ্টির পানি আমার একদম গায়ে সহ্য হয় না ! বৃষ্টিতে ভিজলেই আমার জ্বর চলে আসে । আমি রিক্সাওয়ালা কে জোরে চালাতে বললাম ! 
পুলিশ বক্সের কাছে এসে নিশাত কে দেখতে পেলাম । ছাতা নিয়ে চুপচাপ দাড়িয়ে আছে । কিন্তু বৃষ্টির যা অবস্থা খুব একটা লাভ হচ্ছে না । অর্ধেকের বেশি এরই মধ্যে ভিজে গেছে । আর একটু দাড়িয়ে থাকলে সম্পুর্ণ ভিজে যাবে । আমি রিক্সা দাড় করালাম ওর সামনে । রিক্সার ভিতর থেকেই ডাক দিলাম ওকে । আমার ডাক শুনে খানিকটা চমকালো ।
আমি বললাম রিক্সায় “উঠে আসো । ভিজে যাচ্ছ” ।
-না ঠিক আছে ।
-না ঠিক নেই । অর্ধেক অলরেডি ভিজে গেছ । এভাবে আরো কিছুক্ষন থাকলে পুরো ভিজে যাবে । ঠান্ডা লেগে যাবে । উঠে এস ।
-না আমি ঠিক আছি । রিক্সা নিয়ে চলে যাবো ।
-আরে পাগল হয়েছে ? যে বৃষ্টি শুরু হয়েছে কোন রিক্সা যেতে চাইবে না । উঠে এস ।
-না আমি আপনার সাথে যাবো না ।
ও এই ব্যপার ! আমি রিক্সা থেকে নেমে এলাম । বললাম 
-আচ্ছা ঠিক । আমার সাথে যেতে হবে না । তুমি এই রিক্সা নিয়ে চলে যাও । ঠিক আছে ! নাকি তাও যাবা না ।
নিশাত মনে হয় এটা আশা করে নি । আর কোন কথা না বলে রিক্সায় উঠে বসল । পলিথিন ঠিকঠাক করে নিল । তারপর কি মনে হল ওর ছাতাটা আমার দিকে বাড়িয়ে দিল । বলল 
-আপনি ভিজে যাচ্ছেন ।
আমি বললাম 
-আমি ভিজলে সমস্যা নাই । 
তবুও নিলাম ছাতাটা ।
রিক্সা চলতে শুরু করল । আমি দাড়িয়ে আছি । নিশাতের ছাতাটা হাতে ধরা । মেলতে ইচ্ছা করছে না । কেন জানি ভিজতে ইচ্ছা করছে । হটাৎ করে মনের মধ্যে একটা অদ্ভুদ চিন্তা মাথায় এল ।
নিশাতের সাথে এমন ভাবে যদি বৃষ্টিতে ভেজা যেত ! মন্দ হত না ।
আমি নিশাতের রিক্সা করে চলে যাওয়াটা দেখছি । ঐ দিকেই তাকিয়েই আছি । আমার কেন জানি মনে হচ্ছে নিশাত রিক্সার পেছন পর্দা তুলে ও আমার দিকে তাকাবে । এক ভাবে তাকিয়েই থাকলাম । কিন্তু আমার ধারনা সত্যি হল না । নিশাত ফিরে তাকালো না । 
মন খানিকটা খারাপ হল ।
নিশাত মেয়েটা এমন কেন ! একবার ফিরে তাকালে কি হত ! এই মেয়েটা আসলেই এমন । 

প্রথম যেদিন নিশাতের সাথে দেখা হয় কি ব্যবহারটাই না করেছিল !
নিশাত আমার বাড়িয়ালার মেয়ে । প্রথম যে দিন ওর সাথে দেখা হল যে ঝাড়িটাই না আমাকে মারল । সকাল বেলা মালপত্র নিয়ে বাসায় উঠেছি । সারা দিন গোছগাছে ব্যস্ত ছিলাম । সন্ধ্যার দিকে একটু অবসর নিলাম । যদিও তখনও অনেক কাজ বাকি ছিল । মন বলছিল একটু বিরতি নিতে । 

আমার ফ্লাটটা ছিল ছয় তলায় । তার উপরেই ছাদ । ছতলা বেয়ে নিচে নামার চেয়ে ছাদে যাওয়া টাই শ্রেয় মনে করলাম ।
ছাদে উঠে হাওয়া খাচ্ছি এমন সময় পেছন থেকে খুব কঠিন গলায় কেউ বলে উঠল 
-আপনি ছাদে কেন উঠেছেন ?
পিছনে ঘুরে আমি অবাক না হয়ে পারলাম না । বিশ বাইশ বছরের একটা মেয়ে । গায়ের রং শ্যামলা । কিন্তু মুখে একটা মায়া মায়া ভাব ছিল । প্রথম দেখাতে যে কারো পছন্দ হবে । আমি ভাবতেই পারছিলাম না এই মায়া করা চেহারার মেয়েটা এতো কঠিন করে কথা বলতে পারে ।
মেয়েটা আবার বলল 
-আপনি কেন ছাদে উঠেছেন ?
আমি ততক্ষনে সামলে নিয়েছি । বললাম 
-এমনি উঠেছি । হাওয়া খেতে বলতে পারেন ।
-আপনি জানেন না ছাদে ওঠা নিষেদ ? বাবা আপনাকে বলে নি ?
-কই আমি জানি না তো । আর ছাদে ওঠা নিষেধ এমন কোন সাইনবোর্ড ও লেখা নাই ।
কোন জুটসই উত্তর না খুজে পেয়ে মেয়েটার মুখটা কেমন লাল হয়ে গেল । বলল 
-এখন বলছি এরপর থেকে আর ছাদে উঠবেন না । 
-আরে কেন উঠবো না । এটা কোন কথা ? দেখেন আমি ছতলার বাসাটা ভাড়া নিয়েছি । তারমানে ঐ ফ্লাটের সব কিছুই আমার আন্ডারে পড়ে । ছাদও পড়ে । সুতরাং আমি আসবো ।
দেখলাম মেয়েটা মুখটা আরো লাল হয়ে গেল । ঘুরে যাওয়ার আগে বলে গেল 
-আপনি কিভাবে এ বাড়িতে থাকেন আমি দেখবো ।
আমি বেশ মজা পেলাম । কি মেয়ে রে বাবা । বাসায় আসতে না আসতেই বাড়ি ছাড়ার হুমকি ! 
পরদিনই দেখলাম ছাদের দরজায় তালা মারা । আমার ছাদের ওঠার সমাপ্তি ঘটল । পরে খোজ নিয়ে জানলাম মেয়েটা বাড়িওয়ালীর মেয়ে । একমাত্র মেয়ে । নাম নিশাত । একটু বদমেজাজী । 
কি এক অজানা কারন বসত ছেলেদের একটুও দেখতে পারে না । কেন কে জানে !

বাসায় আস্তে আস্তেই জ্বর চলে এল । ফ্রেস হয়ে বিছানায় শুয়ে পরলাম ! তার আগে নিশাতের ছাতাটা বারান্দায় মেলে দিলাম । ছাতা এই প্রথম খুললাম । ও যখন ছাতাটা আমাকে দিল কেন জানি খুব ভাল লাগল ।
আমি ভিজে যাচ্ছি বা ভিজে যাবো এই জন্য কি ছাতাটা ও দিল নাকি ওর জন্য রিক্সা ছেড়ে দিলাম তার প্রতিদান স্বরুপ আমাকে ছাতাটা দিল । দ্বিতীয়টা হবার সম্ভাবনাই বেশি । যাক তবুও তো মেয়েটার মাঝে কৃজ্ঞতা বোধ আছে । সে হিসাবে দেখতে গেলে মেয়েটা কিন্তু একেবারে খারাপও না । 
সবার সাথে ভাল ব্যবহার ই করে কেবর ছেলেদের উপরেই যত রাগ ওর । আমি এর আগেও লক্ষ্য করেছি ও ছেলেদের যথা সম্ভব এড়িয়ে চলে ।
কেন চলে ? 
নিশ্চই ওর জীবনে পুরুষ মানুষ নিয়ে কোন অপ্রীতিকর ঘটনা রয়েছে । এবং ঘটনা ঘটেছে বেশ কচি বয়েসেই । আর তখন থেকেই ছেলে মানুষের প্রতি ওর এতো রাগ ।

পরদিন শরীর একটু ভাল হল ! সন্ধ্যার দিকে দেখলাম ছাদের দরজা খোলা । তার মানে নিশাত ছাদে উঠেছে । যাক একটু কথা বলা যাক । আজকে মনে হয় আমার সাথে খারাপ ব্যবহার করবে না ।
নাকি করবে ? করতেও পারে । বিশ্বাস নাই ।
আমি আমার ছাতাটা নিয়ে ছাদে গেলাম । নিশাত ফুলের টবে পানি দিচ্ছিল । আমাকে দেখে সোজা হয়ে দাড়াল । মনে মনে আল্লাহ কে ধন্যবাদ দিলাম । যাক কিছু বলে নি ।
আমি কিছু বলতে যাবো তার আগেই আমাকে অবাক করে দিয়ে নিশাত বলল
-আপনার জ্বর এসেছিল !
-এই তো ! বৃষ্টিতে ভিজলেই জ্বর আসে আমার । বৃষ্টির পানি সহ্য হয় না একদম !
নিশাত আর কিছু না বলে পানি দিতে লাগলো আবার ! আমি বললাম
-ছাতা টা।
নিশাত একবার ছাতার দিকে তাকাল । চোখে জিজ্ঞাসা । বলল 
-এটা তো আমার ছাতা না ।
-হুম । তোমার না । আসলে তোমার ছাতাটা আসতে আসতে হারিয়ে ফেলেছি ।
-হারিয়ে ফেলেছেন ? এই টুকু রাস্তা আসতে আসতে হারিয়ে ফেললেন ?
-আসলে বাসে উঠেছিলাম তো । সিটের উপর রেখেছিলাম । নামার সময় আর নিতে মনে ছিল না ।
নিশাত খানিকক্ষন আমার দিকে তাকিয়ে থাকল । তারপর বলল 
-আসলে মিথ্যা কথা বললে অনেক ভেবে চিন্তে বলতে হয় । তা না হলে ধরা পড়ে যেতে হয় ।
-না । আমি মিথ্যা কথা কেন বলল বল ?
-অপু সাহেব আপনি যখন রিক্সা করে বাড়ির সামনে নামলেন তখন আমি আমার ঘরের জানলার কাছে বসে ছিলাম । আর আমার ঘরের জানলা থেকে আমাদের বাড়ির গেটটা পরিস্কার দেখা যায় । কে আসল না আসল কার হাতে কি আছে কি নিয়ে বাসার ভিতর ঢুকছে সব পরিস্কার দেখা যায় । ঠিক আছে ?
আমি বোকার মত হাসার চেষ্টা করলাম । নিশ্চই একটা ঝাড়ি মারবে এখন । কিন্তু দেখলাম ঝাড়ি মারল না ।
বলল 
-জানতে পারি কেন মিথ্যা কথাটা বললেন ?
আমি আসলে কি বলব বুঝতে পারছিলাম না । বুঝতে পারি নি এভাবে ধরা খেয়ে যাবো ।
নিশাত বলল 
-আচ্ছা তার আগে আর একটা প্রশ্নের জবাব দিন । ভর দুপুর বেলা ঐ কাজটা কেন করলেন । ও রকম বৃষ্টির মধ্যে নেমে গিয়ে আমাকে রিক্সাটা দিয়ে দেওয়াটা কেমন যেন লাগল আমার কাছে ।
আমি কিছুক্ষন চুপ করে থাকলাম ।
তারপর বললাম 
-আসলে আমি বোঝাতে চেয়েছিল জগতের সব পুরুষ মানুষ খারাপ না । তুমি যদি আমার সাথে তখন রিক্সায়ও উঠতে তোমার প্রতি কোন খারাপ আচরন করতাম না ।
নিশাত কিছু না বলে আমার দিকে তাকিয়ে থাকল । আমি বললাম 
-দেখ নিশাত, জগতে যেমন খারাপ মানুষ আছে ভাল মানুষও কিন্তু আছে । মানছি পুরুষ মানুষকে নিয়ে তোমার জীবনে কোন অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেছে তাই বলে তুমি জগতের সব পুরুষ মানুষ কে খারাপ ভাববা এটা কিন্তু ঠিক না । সবাই কে একপাত্রে ফেলাটা বোকামি ।
নিশাত তীব্র কণ্ঠ বলল 
-আপনাকে কে বলল যে আমার সাথে অপ্রীতিকর কিছু হয়েছে ?
-কেউ বলে নি ? বলার দরকার কেন হবে ? তোমার সাথে আমার যতবার কথা হয়েছে অথবা আমি তোমাকে যতবার দেখেছি ততবারই আমার জন্য তোমার চোখে আমি তীব্র ঘৃণা দেখেছি । কিন্তু আমি এমন কেন আচরন কখনও আপনার সাথে করি নি । তাহলে কেন এমন আচরন আমার সাথে ? তারমানে কি দাড়ায় বল ?
নিশাত টবে পানি দেওয়া বন্ধ করে নিচে চলে গেল । আমি দাড়িয়ে রইলাম । কেন জানি আমার কষ্ট হতে লাগল । দুপুর বেলা যখন নিশাতের রিক্সার চলে যাওয়া দেখছছিলাম যখন দেখলাম ও একটা বারের জন্যও পিছন ফিরে তাকাল না তখনও আমার কেন জানি এই কষ্টটা হচ্ছিল । এখনও ঠিক তেমনি একটা কষ্ট হচ্ছে । কেন হচ্ছে ?

তারপর থেকেই একটা পরিবর্তন আসলো ! ছাদের দরজায় আর তালা মারা থাকতো না ! আমি যখন ইচ্ছা তখনই আসতে পারতাম । বিকেল বেলা আসতাম বিশেষ করে ! ঐ সময়ে নিশাত আসতো । চুপচাপ ওর ফুল গাছ গুলোতে পানি দিতো । আমি দাড়িয়ে দেখতাম । টুকটাক কথাও বলতাম ! আগের মত আর রাগত স্বরে কথ বলতো না । এটা ভাল লাগতো ! 

একদিন একটা বোকার মত কাজ করলাম । নিশাতের বাবার কাছে নিশাতের বিয়ের প্রস্তাব পাঠালাম ! 
নিশাতের বাবা আমার দিকে কিছুক্ষন তাকিয়ে থেকে বলল
-তুমি ছেলে হিসাবে ভাল ! চাকরিও কর ভাল ! তবে ?
-তবে ?
ভদ্রলোক কিছুটা ইতস্তত করলেন ! আমি বললাম 
-চাচা ! আপনি আমাকে খোলাখুলি বলতে পারেন ! কোন সমস্যা নাই । 
-তা তো বলাই উচিৎ ! আসলে নিশাত পুরুষ মানুষ একদম সহ্য করতে পারে না ! পুরুষ মানুষ বলতে কেবল আমি আছি ! এমন কি আমাদের পরিবারের কোন পুরুষ আত্মীয় আমাদের বাসায় আসে না । আসতে পারে না নিশাতের জন্য !
-কেন ? আশ্চার্য ! কারন কি ?
ভদ্রলোক তবুও চুপ করে রইলেন ! আমার মনে হল তিনি বলতে চান না ! আমি আর কিছু জিজ্ঞেস করলাম না ! কিছুক্ষন চুপ করে বসে থাকার পরে যখন উঠে যাব তখনই নিশাতের বাবা মুখ খুলল 
-আসলে নিশাতের তখন এগারো বছর বয়স ! ও ক্লাস সেভেনে পর‌তো ! তখন কার একটা ঘটনা ! 
-কি ঘটনা ?
-আমার এক চাচাতো ভাই এসেছিল গ্রাম থেকে ! আমাদের বাসাতেই থাকতো ! আমি তো সব সময় অফিসেই থাকতাম । একদিন কি কাজে নিশাতের মা বাইরে গিয়ে ছিল ! বাজারে মনে হয় তখনই নিশাত কে একা পেয়ে.......
-আঙ্কেল থাক । বলতে হবে না । আমি আর শুনতে চাই না । 
দেখলাম ভদ্রলোকের চোখে পানি ! 
-সেদিনের পর থেকে নিশাত একদম বদলে গেল । আমার হাসি খুশি মেয়েটা একদম নিস্চুপ হয়ে গেল ! কিছুদিন তো যে কোন ছেলে মানুষ দেখলেই ভয় পেত । একটু বড় হলে পুরুষ মানুষের প্রতি তার এক তীব্র ঘৃণা জন্মে । 
আমি চুপ করে বসে রইলাম । নিশাতের বাবাও চুপ করে বসে রইলো । আমার যাবার সময় হলে আমি উঠে দাড়ালাম । 
-তবুও একবার নিশাত কে বলে দেখবেন ! যদি ও রাজি হয় !
নিশাতের বাবা একটু অবাক হল আমার কথা শুনে ! 
তারপর বলল
-আচ্ছা ! দেখি ! 

ঐ দিন রাতের বেলা আমার ঘরে কড়া নড়লো ! ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি দশটার কাছাকাছি বাজে । এই রাতের বেলা কেউ আসার কথা না আমার কাছে । দরজা খুলেই দেখি নিশাত ! 
-তুমি ! 
-আপনার সাথে কথা আছে ! 
আমার মনটা খুশি হয়ে উঠল ! মনে মনে বললাম তোমার সাথেও আমার কথা আছে সুন্দরী । 
কিন্তু কিছু বললাম না ! নিশাত বলল
-ছাদে আসেন ! 


-আপনি বাবার কাছে কি বলেছেন ?
ছাদে আসতে না আসতেই নিশাতের প্রশ্নের বান । ওর কন্ঠটা বেশ তীব্র শোনাচ্ছিল ! আমি বললাম
-কেন ?
-কেন না ! কি বলেছেন ?
-আমি যতদুর জানি তুমি জানো ! কেন আবার জানতে চাইছো ?
-কেন বলেছেন ?
-দেখ এই প্রশ্ন করা অবান্তর । আমি কি খারাপ কিছু বলেছি ? আমি কাকে পছন্দ করবো না করবো এটা একান্তই আমার ব্যাপার । এটার জন্য আমি কারো কাছে কিছু বলতে বাধ্য না । আমি প্রপোজ করেছি তুমি চাইলে মানা করে দিতে পারো ! 
-তা তো দেবোই ! কোন পুরুষ মানুষকে আমি সহ্য করতে পারি না ! ওরা মানুষ না ! ওরা ....
-জানোয়ার ? 
নিশাত আমার কথার জবাব দিল না । আমি বললাম
-তোমাকে আমি বুদ্ধিমান ভেবেছিলাম । কিন্তু তুমি তো বেশ বোকা !
-মানে কি ?
-না যে মেয়ে মাত্র একটা পুরুষ মানুষ দিয়ে পুরা পুরুষ জাতিকে সে তো বোকা ! আসলে বোকা, মহা বোকা ! বোকার রাজা ! আরে রাজা না ! রানী ! তুমি বোকার রানী ! মহা রানী !
নিশাত আমার দিকে তাকিয়ে কঠিন করে বলল
-আপনার কি মনে হচ্ছে আমি আপনার সাথে আমি ইয়ার্কী মারছি ! 
-মারো দেখি ! তখন তোমাকে কেমন লাগে একটু জানতে ইচ্ছে করছে ! সারাক্ষন এমন গম্ভীর হয়ে থাকো !
নিশাত আর কোন কথা বলতে পারলো না ! চলে গেল ! 

আমি দাড়িয়েই রইলাম ! কেন জানি মনে হল এই মেয়েকে বিয়ে করতেই হবে ! 
যেমন করেই হোক ! 

পরদিন সকাল বেলা হাজির হয়ে গেলাম ওদের বাসায় ! আমাকে দেখে ওর বাবা মা দুজনেই অবাক ! আমি একটু সহজ গলায় বললাম
-আন্টি আজকের সকালের নাস্তাটা আপনাদের সাথে করতে পারি ? কেন জানি বাসার কথা খুব মনে পড়ছে । সকাল বেলা সবাই এক সাথে নাস্তা করা হয় না ! বহুত দিন !
প্রথমে অবাক হলেও নিশাতে মা আনন্দের সাথে রাজী হয়ে গেলেন ! 
সকাল বেলা নাস্তা খাচ্ছি তখনই নিশাত এসে হাজির ! 
আমাকে দেখে খুব বেশি অবাক হল ! তার থেকেও অবাক হল আমি যখন বললাম
-আরে ! এতো দেরি করে কেউ ! তোমার ক্লাস আছে না ! দেরী হয়ে যাবে । আন্টি জলদি নাস্তা দেন ওকে ।
নিশাত গম্ভীর মুখে নাস্তা খেতে লাগলো ! কোন কথা বলল না ! 

বাইরে এসেও যখন ও রিক্সা খুজতেছিল আমি ওর পাশে দাড়িয়ে পরলাম ! 
-আমি ......।
-চুপ কোন কথা না !
-আরে !
-আপনার কোন কথা শুনতে চাই না ! শুনেন আপনি আমার পেছন পেছন আসবেন না ! 
-আরে ! ভাল বুদ্ধি দিয়েছো তো ! আমি তোমার পেছন পেছন আসতাম না ! অফিসে যেতাম । তবে এখন আসতে হবে মনে হচ্ছে ! 
নিশাত রিক্সা নিয়ে চেল গেল ! আমিও ওর পিছু নিলাম ! ওর ভার্সিটি পর্য্ন্ত গেলাম ! 
নিশাত আমার দিকে গম্ভীর ভাবে তাকিয়ে চলে গেল ভিতরে ! 
আমার কেন জানি একটা পাগলামি করতে মন চাইলো ! ঐ খানেই বসে রইলাম ! যতক্ষন না নিশাত ক্লাস শেষ না করে আসে ! 
অফিসে ফোন করে দিলাম । অসুস্থ ! 

নিশাত বাইরে বের হল প্রায় সাড়ে তিন ঘন্টা পরে ! আমাকে দেখে আসলেই অবাক হল ! আমাকে এই ভাবে বসে থাকতে দেখবে আশা করে নাই ! 
পরদিনও তাই করলাম ! ওর পেছন পেছন আসি ! বসে থাকি মাঠের ভিতর । তারপর আবার ওর পেছন পেছন বাসায় যাই !
নিশাত গম্ভীর মুখেই থাকে ! 
আল্লাহ ! এই মেয়ে কি একটুও পরিবর্তন হবে না ?

সপ্তাহের শেষ দিনে একটু বিপদে পড়ে গেলাম ! তুমুল বৃষ্টি আরাম্ভ হল ! এবার ভাবলাম বিল্ডিংয়ের ভিতরে যাই ! 
গেলাম না ! মাঠের ভিতরেই বসে বসে ভিজতে লাগলাম ! 
কিছুক্ষন ভিজার পরেই মনে হল জ্বর আসবে । আমার ঠান্ডা পানি একদমই সহ্য হয় না ! 
হঠাৎ করেই পেছন থেকে কে যেন মাথার উপর ছাতা ধরলো ! 
তাকিয়ে দেখি নিশাত । মুখটা সেই গম্ভীর হয়েই আছে ! 
-হাই !
-ঢং করবেন না ! বৃষ্টিতে ভিজলে না আপনার জ্ব র আসে ? 
-আসে তো !
-তাহলে কেন ভিজছেন ?
-বৃষ্টিতে ভিজলে কেবল জ্বর আসে না তুমিও আসো ! সেদিনও এসেছিল আজকেও ! 

আমি হঠাৎ করেই নিশাতের কাছ থেকে ছাতা নিয়ে নিলাম ! 
-কি করছেন ?
-আজকে একটু ভিজি তোমার সাথে ?
কিছু একটা বলতে গিয়েও নিশাত বলল না ! আমি বললাম
-কেবল এই টুকু ! একটা বৃষ্টি আমি তোমার সাথে ভিজতে চাই ! আর কিছু না !
নিশাত আমার দিকে তাকিয়ে রইলো কিছুক্ষন ! তারপর বলল
-আপনার জ্বর আসবে !
-কোন সমস্যা নাই ! তোমার সাথে এক মিনিট বৃষ্টিতে ভেজার জন্য হাজারটা দিন জ্বরে ভগতে রাজি আছি ! 
কেন জানি নিশাত অবাক হয়ে আমার দিকে কিছুক্ষন তাকিয়ে রইলো ! সেই চোখে আগের মত আর ঘৃণা নাই ! আমি খুব সাহস করে বললাম 
-হাতটা কি একটু ধরতে দিবে ?
-জি না ! 
-একটু ! ঘড়ি ধরে এক মিনিট ! 
-হাত ধরে কি হবে ?
আমি প্রশ্নের জবাব দিলাম না ! সাহস করে ওর হাত ধরেই ফেললাম ! 

বৃষ্টির বেগ যেন বাড়তেই থাকলো ! বারান্দায় দাড়িয়ে থাকা কিছু অবাক চোখ আমাদের দিকে তাকিয়ে রইলো ! তাদের মনে হয়তো একটাই প্রশ্ন যে মেয়েটা এতোদিন একটা ছেলের সাথে একটু কথাও বলে নাই আজকে কিভাবে একটা ছেলে হাত ধরে বৃষ্টিতে ভিজতেছে ! 
আশ্চার্য !! 

No comments:

Post a Comment